কবিতার অনুবাদের পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি। নারীর সৌন্দর্য ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কিত প্রগলভ উক্তিও শোনা গেছে কবিতা অনুবাদের বিপক্ষের যুক্তি হিসেবে। যে ফরাসি দেশে নারীকূলের সৌন্দর্য ও বিশ্বস্ততা প্রায়ই বিতর্কিত বিষয়, সেখানেও উনিশ শতকে/বিশ শতকে প্রায়ই শোনা গেছে কবিতা অনুবাদের বিপক্ষ যুক্তি। তারপরও অনুবাদ স্বীকৃত সাহিত্য-কর্ম। তারপরও অনুবাদ-কর্মকে বিবেচনা করা হয় বহির্বিশ্বে অন্যভাষী সাহিত্যকে পরিচিত প্রদানের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে। বাংলা সাহিত্যের সম্ভাবনা ও শক্তি সম্পর্কে বহির্বিশ্বে স্পষ্ট ধারণার অভাব বর্তমান বিশ্বায়নের সময়েও যে প্রকট তার একমাত্র কারণ বাংলা সাহিত্যের পর্যাপ্ত অনুবাদ কর্মের অনুপস্থিতি। বর্তমান বৈশ্বিক অবস্থানে এখন পর্যন্ত ইংরেজি ভাষার অবস্থান আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে প্রথম। যদিও ইংরেজি ভাষার আবেদন অনেক দেশে ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে।
বাংলা ভাষায় কথা বলেন এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কম নয়। কিন্তু বাংলা এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাভাষী মানুষের বাইরে খুব কমই ব্যবহৃত হয়। বাংলা ভাষার কবি সাহিত্যককে তাই অপেক্ষা করতে হয় তাদের সাহিত্যকর্মের ইংরেজি কিম্বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক ভাষায় অনুবাদের জন্য। ইদানিং বাংলাভাষার কিছু কিছু লেখা বহির্বিশ্বে অনূদিত হচ্ছে। কিন্তু বলাই বাহুল্য, প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল। এতোসব কথা বলা হলো সম্প্রতি, অতিসম্প্রতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রকাশনা-প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলাদেশের কবি শাহাবুদ্দীন নাগরীর একটি পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থের প্রকাশনার কারণে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের প্রধান নগরী ব্লুমিংটনের বনেদি প্রকাশনা-প্রতিষ্ঠান ‘অথরহাউস’ প্রকাশ করেছে শাহাবুদ্দীন নাগরীর ‘দি ব্ল্যাক ক্যাট এ্যান্ড আদার পোয়েমস’। বইটির প্রকাশনাকাল সেপ্টেম্বর, ২০১১।
সত্তর দশক আমাদের সাহিত্যের এক উজ্জ্বল সময়। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে একদল তরুণ, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সাম্প্রতিক চেতনাকে অন্তরে ধারণ করে দেশগড়ার সংগ্রামের সঙ্গে সাহিত্য সৃষ্টির কাজে ব্রতী হন। নাগরী তাদেরই একজন। যদিও সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই নাগরীর পদচারণা, কবিতা ও ছড়ায় মনে হয় তিনি অধিক স্বচ্ছন্দ। এটা অবশ্য আমার ব্যক্তিগত ধারণা। একজন লেখকেরই ভালো বোঝার কথা, সাহিত্যের কোন্ শাখায় তার পদচারণা অধিকতর স্বচ্ছন্দ।
‘দি ব্ল্যাক ক্যাটে’ শাহাবুদ্দীন নাগরীর ৫৩ (তিপ্পান্ন)-টি কবিতা সংকলিত হয়েছে। কবিতাগুলি বাংলায় লেখা এবং ইংরেজিতে অনূদিত, বলাই বাহুল্য। সংকলনে যেমন রয়েছে রোমান্টিক ধারার কবিতা, তেমনি রয়েছে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ পংক্তি। ‘ওকাম্পোর চেয়ারে’র মতো কবিতাও রয়েছে সংকলনে, যা বিশ্বপটভূমি ও ভালোবাসারই দ্যোতক। আবার রয়েছে ‘বরকতের কবর’-এর মতো কবিতা, যা একাধারে আমাদের ইতিহাস ও আবেগের সংমিশ্রণ। ‘মধ্যরাত অবধি আমি আল্পনা আঁকছিলাম শহীদ মিনারে, চারপাশে তুষারের মতো ছড়িয়ে পড়ছিলো শাদা জোছনা/... আমি অবাক হয়ে দেখলাম, মিনারের স্তম্ভগুলো/ নুয়ে পড়লো মাটিতে, হুড়মুড় করে ভেঙে পড়লো চারপাশে নোনাধরা দেয়াল...’ ইত্যাদি একান্তভাবেই দেশজ। অনুবাদে এই সব চিত্রাবলী যতোটা সম্ভব বিশ্বস্ততার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, বিদেশি পাঠকের কাছে শহীদ মিনার ও তার আবেগ আজ মোটামুটি জানা। এই কবিতার পাঠকের কাছে তার বিস্তৃতি আরো ব্যাপক হবে।
নাগরীর বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট সমৃদ্ধ। বিদেশের পটভূমিতে লেখা তার কবিতাগুলি আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে সহজে আবেদন সৃষ্টি করবে। ফ্রাংকফুর্ট, ম্যানিলা, রোমক সভ্যতা কিম্বা সেনজেন ভিসায় আন্তঃইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বিদেশি পাঠকের কাছে সহজবোধ্য হলেও স্বদেশি পাঠকের পক্ষে এর কাব্যমূল্যের আস্বাদন কঠিন কিছু নয়।
শাহাবুদ্দীন নাগরী তার এই কাব্যগ্রন্থের দ্বারা শুধু যে তার কবিতার সঙ্গেই বিদেশি পাঠকের যোগসূত্র স্থাপন করলেন তা নয়, বরং বলা যায়, এর দ্বারা তিনি বিদেশি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছেন বাংলাদেশ নামক ভূখ- ও এর ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রতি। আন্তর্জাতিক পরিম-লে বাংলাদেশের কোনো কবির এই যে উপস্থিতি, তা সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। বর্তমানে যে তথ্য আদানপ্রদানের নেটওয়ার্ক, তার কল্যাণে অচিরেই কবি শাহাবুদ্দীন নাগরী, তার কাব্যগ্রন্থ ‘দি ব্ল্যাক ক্যাট এ্যান্ড আদার পোয়েমস’-এর প্রতিই বিশ্বপাঠক সমাজের দৃষ্টি আকৃষ্ট হবে না, আকৃষ্ট হবে বাংলা কবিতার প্রতিও। এটাও এক বিরাট প্রাপ্তি।
দি ব্ল্যাক ক্যাট অ্যান্ড আদার পোয়েমস : শাহাবুদ্দীন নাগরী। প্রকাশক : অথরহাউস, ইন্ডিয়ানা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পেপারব্যাক। পৃষ্ঠা : ৮০ । মূল্য : ৮.৯০ মার্কিন ডলার। প্রকাশকাল : সেপ্টেম্বর, ২০১১। তথ্যসূত্র www.amazon.com
আরটিএনএন ডটনেট/শিল্প-সাহিত্য/এসবি